বাংলাদেশের দুই শত্রু : করোনা ও চালচোর

শেয়ার করুনঃ

সৈয়দ মেহেদী হাসান ।।

একটি সংবাদ আমাকে কাঁদিয়েছে। ১৫ এপ্রিল প্রকাশিত সংবাদভাষ্য সাবলিল হলেও তারমধ্যে ফুটে উঠেছে যুদ্ধাক্রান্ত একটি দেশের অভ্যান্তরীন দৃশ্যপট। ‘সাড়ে ৩শ কি.মি. সাইকেল চালিয়ে বরগুনা গেলেন করোনা আক্রান্ত যুবক’ শিরোনামটি। সংবাদ বলছে, সে তার মায়ের সাথে দেখা করার জন্য তিনদিন ধরে সাইকেল চালিয়েছেন। ওই যুবক জানে তিনি করোনা আক্রান্ত। বাংলাদেশ পরিস্থিতি বলছে, বয়স্কদের সাথে পাল্লা দিয়ে যুবকরাও মারা যাচ্ছেন। ওই যুবক আক্রান্ত হওয়ার পর বুঝে গেছেন হয়তো নাও বেচে থাকতে পারেন। আর তাই জীবনের শেষ ইচ্ছা মায়ের সাথে দেখা করার জন্য ছুটে এসেছেন সাড়ে তিন শ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। এটি যে শুধু বরগুনার ওই যুবকের জীবনের গল্প তা কিন্তু নয়, আপনার আমার জীবনের গল্পটাও এমন পরিস্থিতিতে দাড় করিয়ে দিতে পারে কভিড-১৯। দিন যত যাচ্ছে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। বাড়ছে হাসপাতালের শয্যা সংকট। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছেই। দুনিয়াজোড়া রোগাক্রান্ত মানবসভ্যতায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কে কখন কোন হাসপাতালে বা বাড়িতে স্বজন হারাচ্ছেন কিংবা নিজে বিদায় নিচ্ছেন সেটাই মূল বিবেচ্য।

মানুষ মারা যাচ্ছেন, লাখ লাখ আক্রান্ত হচ্ছেন; ভাইরাসের সন্ত্রাসে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে বাইরের দুনিয়া। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন হতাশ, বিজ্ঞানের সৃষ্টির অপেক্ষায় যখন গোটা মানব সভ্যতা তখনো কিন্তু মন ভালো করার খবরও আসছে।

লক্ষ্যনীয় ব্যপার হলো, বরগুনার পোশাক শ্রমিক সেই যুবকের যে দৃঢ়তা, মানসিক শক্তি তা নিঃসন্দেহে করোনা যুদ্ধ জয়েরই গল্প হতে পারে। তিনি জানেন কভিড-১৯ তার শরীরে বাসা বেঁধেছে। সেজন্য থেমে থাকলে চলবে না। তার মায়ের কাছে তাকে যে যেতেই হবে।

রবার্ট ফ্রস্টের জগৎখ্যাত ‘স্টপিং বাই উডস অন অ্যা স্নোয়িং ইভিনিং’ এর ম্যরাল অব স্টোরিটা এখানে মিলে যায়। ফ্রস্ট বলেছেন,

The woods are lovely, dark and deep,

But I have promises to keep,

And miles to go before I sleep,

And miles to go before I sleep.

৯৭ বছর আগে লেখা এই কবিতা আমাদের এখনো বলে, স্থির হওয়া যাবে না। এগিয়ে যেতে হবে। চিরবিদায়ের আগে তোমার কাজ শেষ করে যেতে হবে। শুধু কবিতা নয় বরগুনার যুবক শেখালেন আক্রান্তই শেষ কথা হতে পারে না। লক্ষ্যে আমাদের যেতেই হবে। করোনার বিরুদ্ধের যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে।

কিন্তু বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে ফ্রস্টের ৯৭ বছর আগের দর্শন বা ২০২০ সালে পোশাক শ্রমিকের সাইকেল চালানোর গল্পটা কি সত্যিই মোকাবেলার ষোলআনা পূর্ণ করছে? এমন প্রশ্নের একটা ব্যাখ্যাও রয়েছে আমার।

খেয়াল করলে দেখবেন, বিশ্বেজুড়ে মূখ্য আলোচ্য কভিড-১৯ মোকাবেলা। বাংলাদেশও বিশ্বের বাইরে নয়; সেহেতু আমরাও আলোচ্য তালিকায় রাখি কভিড-১৯। মুশকিল হলো কভিড-১৯ এর আক্রমনও হার মানছে দেশের আরও কিছু সংবাদ শিরোনাম। এককথায় বলতে গেলে, বাংলাদেশে দুটি প্রসঙ্গ চলছে সমান্তরালে। করোনা ও চাল চোর। বাংলাদেশ যুদ্ধ করছে দুই শত্রু করোনা মোকাবেলা ও চালচুরি ঠেকানো। কি দুর্ভাগ্য আমাদের! সারা বিশ্ব যেখানে একটিমাত্র শত্রু করোনা মোকাবেলা করছে আমরা সেখানে গোদের ওপর বিষফোড়ার মত চোর ধরতে ত্রাহি ত্রাহি দশায় রয়েছি।

সঙ্গত প্রশ্ন জাগে, এই মহামারিতেও যারা লোভ সংবরণ করতে পারেন না। কেড়ে নেন গরিবের মুখের খাবার; তারা কি করোনাক ভয় পান না? তারা কি ফেরাউনের বংশধর? নাকি চিরন্তন সত্য মৃত্যুর মুখোমুখি কোনদিন দাড়াবেন না?

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে ওএমএসসের চাল মেরে দিচ্ছে ডিলার, কর্মহীন জেলেদের চাল মেম্বার চেয়ারম্যানের ঘরে, ত্রাণের টিন চৌকিদারের পুকুরে, গর্ভকালীন ভাতা পেতে চাই ঘুষ, কাবিখার চাল নিয়ে যায় জনপ্রতিনিধিদের শালা-সমুন্ধী, অতিদারিদ্রের কর্মসৃজন প্রকল্পের টাকা ভাগ করে নেন প্রভাবশালীরা ইত্যাদি ইত্যাদি শিরোনাম দেখতে দেখতে মানুষ ক্লান্ত।

এইসব জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিকদের সামাল দিতে খোদ রাষ্ট্র ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে। চোরের উৎপাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ওএমএসের চাল বিক্রয়। এত চোর বাংলাদেশে?

একবিশং শতাব্দীতে দেশ যখন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করে বিশ্বে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে; তখনও এসব রাজনীতিবীদ/জনপ্রতিনিধি নিজেদের অবস্থান বদল করেননি। তারা চুরির কৌশল করেছেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আসলে বাঙালীর পালস্ বুঝতেন। তিনি জানতেন বাঙালী অত্যান্ত আবেগী, সংগ্রামী। আবার এও জানতেন চৌর্যবৃত্তিতে খুব পাকা হাতও রয়েছে নেতাদের। সেকারনেই হয়তো আফসোস করে বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি। আমি পেয়েছি চোরের খনি।’

স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পর চুরি বিদ্যায় জনপ্রতিনিধি/রাজনীতিবিদরা যে আরও সমৃদ্ধ হয়েছে তা করোনা না এলো বোঝাই যেত না। যে কারনে কৌতূহলী মানুষ টেলিভিশন, নিউজ পোর্টাল, পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে দুটি বিষয়ের সংবাদ খোঁজেন। প্রথমত করোনা আক্রান্ত ওয়াল্ডোমিটার কতখানি লাল হলো? দ্বিতীয়ত নতুন করে কোন কোন এলাকায় চালচোর ধরা পড়েছে?

সরকার মিলিয়ন মিলিয়ন মেট্রিকটন খাদ্য সহায়তা, তেল, ডাল, চিনি দিচ্ছে গরিব-দুঃখি আর্তমানুষের জন্য। আর সেই বরাদ্দ গরিব পায় না। মাঝপথে খেয়ে পেলে পোশাকধারী ইঁদুরেরা। গোডাউনে কোন ইঁদুর যদি বস্তা কাটে স্বভাবতই মানুষ সেই নিরিহ প্রানীটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। কিন্তু মহামারিতে মিলিয়ন মিলিয়ন মেট্রিকটন খাদ্যদ্রব্য খেয়ে সাবার করে দিচ্ছেন যারা তাদের বিচার যা হচ্ছে তা মন্দের ভালো। এই বিচারও হয়তো হতো না; যদি না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই খাতে দৃষ্টি দিতেন। আমি মনে করি, ১৭৫৭ সালে পলাশীর ময়দানে বাঙালীর স্বাধীনতা লুষ্ঠিত করে মীর জাফর যেমন বেঈমানী করেছেন। মীর জাফর একটি নাম নয়; এখন গালি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা পাকিস্তানী মিলিটারীর হাতে বাঙালী তুলে দিয়ে শান্তি পেয়েছে সেই বিশ্বাসঘাতক রাজাকার-আলবদর-আল শামসদের করুণ পরিণতি এই বাংলার মাটিতে হয়েছে। এই প্রজন্ম তা প্রতক্ষ্য করেছে। ১৭৫৭ থেকে ১৯৭১-এর বিশ্বাসঘাতকদের বংশপরম্পরা ২০২০ সালে এসেও আমাকে ভাবিয়ে তোলে। পার্থক্য কোথায়? করোনা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে সরকারের দেওয়া খাদ্য সামগ্রি যখন কোন বাঙালী চুরি করে নিয়ে যান; তিনি মীর জাফর বা রাজাকার-আলবদর-আল শামস চরিত্রের চেয়ে কম কিসে? এদেরও ট্রাইব্যুনাল করে বিচার করা হোক।

প্রকৃতিকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে না দেওয়ায় কোটি কোটি সৃষ্টির মধ্যে মাত্র একটি জীবানু মানুষের কর্মকান্ডে প্রতিবাদ করেছে। সভ্যতার ওপর চড়াও হয়ে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে তার আপন গতিপথে। তদ্রুপ মানব বিধ্বংসী জীবানু করোনা বিরোধী যুদ্ধে যে চোরেরা রাষ্ট্রের স্বাভাবিক গতিপথকে আটকে দিচ্ছে তাদের ওপর আরও কঠোর হতে হবে। চাল-ডাল-তেল চোরদের এই যুদ্ধে বিনাশ ঘটাতে না পারলে মানবতা পরাজিত হবে। আমরা চাই না মানবতার মৃত্যু হোক। চাই করোনা বিদায় হোক; ধ্বংস হয়ে যাক চালচোর মানবতা বিরোধীরা।

লেখক : কবি ও সাংবাদকর্মী
mehedinewsbsl@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *