বাধাগ্রস্ত আমাদের দর্শন চিন্তা

শেয়ার করুনঃ

ধরা হয় আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ অব্দে প্রাচীন গ্রিসে সর্বপ্রথম দর্শন চিন্তার উদ্ভব হয়। যদিও অনেকের মতে, ভারতবর্ষেই সর্বপ্রথম দর্শন চিন্তার উন্মেষ ঘটে। সে যাই হোক, আমাদের প্রসঙ্গ এটা নয়। জগৎ, জীবন, মানুষের সমাজ, চেতনা এবং জ্ঞানের প্রক্রিয়া প্রভৃতি মৌল বিধানের আলোচনাকে দর্শন বলা হয়। থেলিসকে দার্শনিকতত্ত্বের জনক বলা হয়। তার হাত ধরেই দর্শন আজ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে।
দর্শন হলো জগৎ ও জীবনের সামগ্রিক একটি তাত্ত্বিক আলোচনা, বিচার ও বিশ্লেষণ। বেঁচে থাকার জন্য খাওয়া যেরকম অপরিহার্য, তদ্রুপ স্বচ্ছ একটি জীবনের জন্য দর্শন ঠিক ততটুকুই গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা দেশগুলো দর্শন চিন্তায় যতটা অগ্রসর হতে পেরেছে আমরা তার থেকে ঢের পিছিয়ে আছি। বিশেষ করে, ধর্মান্ধতা এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা হিসেবে কাজ করে। ধর্মান্ধ মানুষের প্রভাব, জ্ঞানস্বল্পতা ও অজ্ঞতার কারণেই আমরা দর্শন চিন্তাকে মূল্যহীন ও অপ্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে ভেবে থাকি। তবে এটি আমাদের মনে রাখতে হবে, দর্শন ছাড়া মানুষের জীবন অচল। আমরা যতই দর্শনকে অবজ্ঞা করি না কেন মনের অগোচরে সবাই দার্শনিক। কেননা, আমরা প্রত্যেকেই কিন্তু কম-বেশি দর্শন চিন্তা করি। অন্তত এ প্রশ্নগুলো আমাদের সবার মাথায়ই ঘুরপাক খায়Ñ জগৎ কেন সৃষ্টি হয়েছে? জগতের উৎস কী? জগতের সারকথা কী? জগৎ নিত্য নাকি সৃষ্ট? ঈশ্বর কে? তিনি কোথায় থাকেন? কী করেন? কেনই বা তিনি এ জগৎ সৃষ্টি করলেন? ঈশ্বরের কাছে যদি কোনোকিছুর অভাব নাই থাকে তাহলে মানুষকে ঈশ্বর কষ্ট দেন কেন? জগৎ নিয়ে খেলা করে ঈশ্বরের লাভ কী? এ রকম হাজারো প্রশ্ন। হয়তো এসব প্রশ্ন মানব সমাজে উত্থাপন করি না বা করার সাহস পাই না। কারণ, এ রকম প্রশ্ন সাধারণত বেশিরভাগ ধর্মেই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং ঈশ্বর প্রদত্ত বাণী ও বিধি-নিষেধের বাইরে কিছু চিন্তা না করতেই সব ধর্মে কঠোরভাবে নিষেধ করা আছে। কিন্তু একটা জিনিস ভেবে দেখেছেন কি? আপনি যদি ধর্মীয় বাণী আর বিধি-নিষেধের মাঝেই ঘুরতে থাকেন তাহলে এ মহাবিশ্বকে জানার, মতামত প্রদান করার বা কিছু আবিষ্কার করার সুযোগ পেতেন? উত্তর আসবে, অবশ্যই না। কারণ, তাহলে বিজ্ঞানের সব আবিষ্কারকে অস্বীকার করা হবে। অথচ বিজ্ঞানের সাধনার ফসল কিন্তু আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই সমহারে ব্যবহার করে যাচ্ছি। এটাকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই।
এ কথা সত্য, একমাত্র দার্শনিক চিন্তাধারার মাধ্যমেই জগৎ, জীবন, স্রষ্টা, সৃষ্টি ও ধ্বংসের সব রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব, অন্যথায় নয়।
ধর্মের প্রভাবে দর্শনকে আমরা ধারে-কাছে ঘেঁষতে দিই না। কিন্তু আমরা কেউই আসলে দর্শনের ঊর্ধ্বে নই। আজ আপনি আপনার সন্তানকে ১২ থেকে ১৪ বছর ধরে পড়িয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে যখন আপনার সন্তানটির জন্য দর্শন বিভাগে আসন নিশ্চিত হলো তখন আপনার মাথায় যেন বাজ পড়ল। আপনার সন্তান দর্শনে পড়বে শুনেই যেন আপনার পিলে চমকে উঠবে। হয়তো সন্তানের পড়ালেখা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন না হয় অন্য কোথাও অন্য বিষয় পড়ানোর চেষ্টা করবেন। অথচ দর্শনই হলো সব বিষয়ের মূল। সব বিজ্ঞানের বিজ্ঞান।
দর্শনের প্রতি আমাদের এরূপ মনোভাবের পেছনের কারণ দুটি। প্রথমত, আমরা চিন্তা করি একজন ছাত্র দর্শনে পড়ালেখা করে ভবিষ্যতে করবে কী? একমাত্র অধ্যাপনা ছাড়া দর্শনের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। দ্বিতীয়ত, আমরা চিন্তা করি, দর্শন পড়লে মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে যায়। যে কুয়াতে ব্যাঙ থাকে তখন সে কুয়াকেই তার পৃথিবী মনে হয়। বাইরের আর কিছু সম্পর্কে তার ধারণা থাকে না। সে কুয়াকেই সবকিছু মনে করে। তদ্রুপ ধর্মের বেড়াজালের গ-ি মানুষকে কূপম-ূক করে রাখে। সে গ-ি পার হতে পারলে সামগ্রিক বিষয় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করা সম্ভব। সৃষ্টি, পরম সত্তা, জগৎ ও জীবনের একমাত্র স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে দর্শনে। মহা দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘নো দাইসেল্ফ’। অর্থাৎ নিজেকে জানো। কারণ একমাত্র নিজেকে জানার মাধ্যমেই অপরকে জানা সম্ভব। যদিও আমরা সসীম জগতের বাইরে কল্পনা করতে পারি না তবুও এ সসীমতার মধ্যেই রয়েছে অসীম জগতের দিকনির্দেশনা।
পশ্চিমা দেশগুলোতে দর্শনকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, কোনো শিক্ষার্থী যখন দর্শন পড়ার সুযোগ পায় তারা ততটাই খুশি হয়, আমরা ইংরেজি বিষয় পেলে যতটা খুশি হই বা কার্যকর মনে করি। এমনকি পশ্চিমা দেশগুলোতে দর্শন শিক্ষা ও সাধনার জন্য আলদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আমাদের গতানুগতিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে, পড়ালেখা শেষ করে একটা চাকরি পাওয়া। তাছাড়া আমরা মূলত পরীক্ষায় পাসের জন্যই পড়ি, জানার জন্য নয়। যদি জানার জন্য কিছু পড়তে হয় তাহলে দর্শন অনিবার্য। আমি বলছি না যে, ইংরেজি, গণিত, পদার্থ বাদ দিয়ে হুমড়ি খেয়ে দর্শনে এসে পড়–ন। যদি জানার আগ্রহ থাকে তাহলে যে যে বিষয়েই পড়ুক না কেন দর্শন চর্চা সেখানে থেকেও করা সম্ভব। সেজন্য প্রয়োজন শুধু ইচ্ছাশক্তি। কিছুদিন আগে আমার এক বড় ভাই ফেইসবুকে একটা পোস্ট করেছিলেন, ধর্মান্ধ আর ধর্মানুসারী এক নয়। আমাদের উচিত ধর্মানুসারী হওয়া, ধর্মান্ধ নয়।
কথাটি আমার এতই ভালো লেগেছিল যে আজকের আলোচনায় এ বিষয়টি তুলে না ধরে পারলাম না। কেননা, ধর্মান্ধতা মানুষকে এক প্রকার অন্ধ করে রাখে। মানুষের ধর্ম আর কয়েকটি ধর্মীয় বই-ই তার পৃথিবী হয়ে যায়। ধর্মের বাইরে যেন কিছুই ভাবার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যারা ধর্মের অনুসারী তারা কিন্তু ধর্মের চৌকাঠের মধ্যে বন্দি থাকে না বরং চৌকাঠ পেরিয়ে জ্ঞান অন্বেষণের মাধ্যমে ধ্রুব সত্যকে উদঘাটন করে সূর্যের নতুন দিগন্ত সূচনা করে। আজকাল অনেক মাদ্রাসার ছাত্রও দর্শন বিভাগে পড়ছে। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে গেলে দেখবেন অনেক পাঞ্জাবি-টুপি পরা ছেলে দর্শন অধ্যয়ন করছেন। শুধু তাই নয়, দর্শনে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ছাত্রছাত্রীই পড়াশোনা করেন। কারণ জ্ঞান অন্বেষণে কোনো ধর্মেরই বাধা নেই। বরং ধর্মে থেকে দর্শন চর্চা করলে দর্শন বোঝা আরও সহজ হয়ে যায়।
পশ্চিমা দেশগুলোতে দর্শনের শিক্ষা ছাড়া তাদের শিক্ষা পরিপূর্ণ হয় না। এমনকি একটি শিশু বাচ্চাও বাদ যায় না দর্শনের ছোঁয়া থেকে। আরেকটি খুব সাধারণ বিষয় দেখলে বুঝতে পারি, বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ ডিগ্রি হলো পিএইচডি। আর এ পিএইচডির পূর্ণ অর্থ হলো ‘ডক্টর অব ফিলোসফি’। অর্থাৎ, একটা মানুষ যখন কোনো বিষয়ের সর্বোচ্চ জ্ঞান লাভ করে দার্শনিক চেতনায় উন্নীত হন তখন তিনি এরূপ ডিগ্রি অর্জনে সমর্থ হন। এ থেকেই আমরা বুঝতে পারি দর্শন কতটা গভীর। পৃথিবীর সব বিষয়ের মূল হলো দর্শন। দর্শনকে সবাই উপলব্ধি করতে পারে না। অযথাই ধর্ম আর দর্শনকে গুলিয়ে ফেলেন। অর্থাৎ দর্শন যেহেতু সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিষয়, সেহেতু একে উপলব্ধি করার জন্যও প্রয়োজন সর্বোচ্চ চিন্তা এবং সুসংহত মস্তিষ্ক।
তাই আসুন আমরা দর্শনকে বুঝি, বুঝতে চেষ্টা করি, সম্মান করি, ভালোবাসি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দর্শনের পথ করে দিই সুপ্রসন্ন।

তুফান মাজহার খান
প্রাবন্ধিক, কবি ও কথাসাহিত্যিক

সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *