কার পাপে পদ্মা এমন সর্বগ্রাসী?

শেয়ার করুনঃ

পৃথিবীর সৃষ্টি কবে তা মানুষের অজানা। তবে তা যে মানবসৃষ্টির বহু যুগ আগে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি পানি থেকে প্রতিটি প্রাণবান বস্তুকে সৃষ্টি করেছি।’ আল কোরআন, সুরা ২১ : আয়াত ৩০। আল্লাহ পৃথিবী ভর্তি পানি থেকে প্রস্তর মন্ডিত মক্কার ভূমিকে কেন্দ্র করে সপ্তমহাদেশ সন্নিবিষ্ট করেন। আল্লাহ কোরআনে মক্কা নগরীকে ‘উম্মুল কোরা’ বলেছেন। যার অর্থ পৃথিবী সকল জনপদের মা-উৎপত্তি বা শিকড়।

আল্লাহর অদৃশ্য সৈনিক ফেরেশতারা তিনভাগ জলের ভেতর একভাগ স্থলকে যে আকারে স্থাপন করেছেন, কোটি কোটি বছরেও তাতে মৌলিকভাবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সমুদ্র পৃষ্ঠ ভূ-পৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচু হলেও সমুদ্র পৃথিবীকে গ্রাস করেনি। কেয়ামতের আগে করবেও না। বলা হয়, প্রতি মুহূর্তে সমুদ্র পৃথিবীকে গ্রাস করতে চায়। আল্লাহ হুকুম দেন না বলে প্রতিনিয়ত উপকূলে এসেও সে ফিরে যায়। সেদিন আর ফিরে যাবে না। উচ্ছাসিত ও বিস্ফোরিত হয়ে ভূ-ভাগকে গ্রাস করবে।

‘ওয়া ইযাল বিহারু ফুজ্জিরাত’। আল কোরআন, সুরা ৮২: আয়াত ৩।

পৃথিবীর স্থিতি ধরে রাখতে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন পর্বতমালা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘পর্বতমালাকে আমি সৃষ্টি করেছি ভূ-পৃষ্ঠের পেরেক স্বরূপ।’ আল কোরআন, সুরা ৭৮: আয়াত ৭। তিনি আরও বলেন, ‘আমি পৃথিবীকে সমতল করেছি, এতে প্রবাহিত করেছি অসংখ্য নদী নালা। আর মানুষের জন্য প্রচলন করেছি পথ-ঘাটের।’ আল কোরআন, সুরা ২১: আয়াত ৩১। পৃথিবীর চেয়ে তিনগুণ পানি হলেও এসব পানের যোগ্য নয়। সমুদ্র ভর্তি পানি যেন কোটি বছরেও নষ্ট না হয়ে যায়, সে জন্য তা করা হয়েছে ভীষণ নোনা। এ থেকে বাষ্প আকারে পানি শূন্যে উঠে গিয়ে আবার আল্লাহর হুকুমে বর্ষিত হয় মিষ্টি সুপেয় বৃষ্টি আকারে। যা দিয়ে পৃথিবীর প্রাণীকুল বাঁচে এবং এর মাধ্যমে তাদের রিযিকও আসে আকাশ থেকে।

পর্বত আল্লাহর শক্তিমত্তার ভয়ে এবং তার করুণার অনুভূতি নিয়ে ক্রন্দন করে। আল্লাহর হুকুমে নেমে আসে ঝর্ণাধারা। এসবই নদীর উৎস। মেরু ও শৃঙ্গের বরফ গলেও নদী হয়। জগতের মোট পানির দশমিক ৩ ভাগ পান করার যোগ্য। আল্লাহর কুদরত এক মুহূর্ত কার্যকর না থাকলে শুধু সুপেয় পানির জন্যই বিশ্বে যুদ্ধ লেগেই থাকবে। পৃথিবীর সৃষ্টি, সমন্বয়, বান্দাদের রিযিক, নদ-নদী, পাহাড়-জঙ্গল, মরুভূমি, বরফ, মেঘ, বৃষ্টি প্রভৃতির পেছনে অসংখ্য অগণিত ফেরেশতা নিয়োজিত আছেন। তাদের প্রধান হযরত মিকাইল আ.।

সমুদ্রের তলদেশে আল্লাহর নবী হযরত মুসা আ. যে রহস্যময় বান্দাকে খুঁজে পেয়েছিলেন, ইসলাম জগতে যিনি হযরত খিযির আ. নামে পরিচিত। তার প্রকৃতি সংক্রান্ত বিশেষ জ্ঞান যুগের নবীর তুলনায় বেশি প্রোজ্জল ছিল বলে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন। প্রকৃতি পরিচালনায় আল্লাহর স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা রয়েছে। বিস্তারিত সুরা কাহাফ দ্রষ্টব্য।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেষ্ট। দীর্ঘতম পর্বতমালা হিন্দুকুশ থেকে গারো পাহাড় পর্যন্ত হিমালয়ান বলয়। আল্লাহর দান ‘মানস সরোবর’ থেকে চীন, ভারত, বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গপোসাগরে গিয়ে পতিত ব্রহ্মপুত্র। অসংখ্য উৎস নদ-নদী যার অন্তত ৭০০ শাখা-প্রশাখা বাংলাদেশ জুড়ে ছিল বিস্তৃত। যে জন্য সবুজে ভরা এ বাংলায় খাদ্য, শস্য, সুপেয় পানি, শাক-পাতা, ফুল-ফল, মাছ ও গৃহপালিত পশু-পাখি তথা অফুরন্ত রিযিকের ভান্ডার দেখেই হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের বহু জাতি এ দেশে এসে বসত গেড়েছে। এ যেন ‘বালদাতুন তাইয়িবাতুন ওয়া রাব্বুন গাফুর’। আল কোরআন, সুরা ৩৪: আয়াত ১৫।

কোরআন বর্ণিত সেই মনোরম দেশ আর আল্লাহর ক্ষমায় বিভূষিত মাতৃভূমি। বর্তমানে উজানে বাঁধের ফলে ৪৯০টি নদী বাধাগ্রস্ত। শুকনোর দিনে বাংলাদেশ মরুভূমি। বর্ষায় বন্যায় বাঁধ খুলে দিলে বাংলাদেশ ভেসে যায়। বাহ্যিকভাবে এ দেশের যে সর্বনাশ গত প্রায় ৫০ বছরে হওয়ার কথা ছিল বলতে গেলে হাজার চক্রান্তের ফলেও তার কিছুই হয়নি। ৮ কোটি মানুষ যত দরিদ্র ছিল, ১৬ কোটি মানুষ এখন গড়ে তারচেয়ে বহুগুণ ভালো আছে। এর কারণ, আল্লাহর সাহায্য কোনো মাধ্যমের মুখাপেক্ষি নয়। আল্লাহ দয়া ও হেফাজত করলে সমগ্র সৃষ্টি জগত মিলেও তা রোধ করতে পারে না।

বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান নদী পদ্মা। অতীতে এর নাম সর্বনাশা পদ্মা। যার কোনো কূল-কিনারা নাই বলে আমাদের সাহিত্যে দেখা যায়। খোদাপ্রদত্ত প্রকৃতির ওপর হীন স্বভাবের মানুষের অত্যাচারে এই পদ্মাই কখনো কখনো ধু-ধু মরুভূমিতে পরিণত হয়। এ মুহূর্তে যখন বর্ষা শেষ, জমাট পানি ভাটিতে বয়ে যাওয়ার মৌসুম শুরু। ক’দিন পর শুরু হবে শুষ্ক মৌসুম। বছরটিও অতি বৃষ্টির নয়। দেশে বন্যা পরিস্থিতিও নেই। ঠিক তখনই দেখা যাচ্ছে মূলত পদ্মা, পাশাপাশি তিস্তা, ধরলা, মধুমতি, মেঘনা ইত্যাদি নদী জায়গায় জায়গায় ব্যাপক ভাঙচুর চালাচ্ছে। ১০ থেকে ৩০ কি.মি. পাড় সিকস্তির স্বীকার।

বৃহত্তর ফরিদপুর সবচেয়ে বড় ধাক্কায় পড়েছে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী আবার বিশেষ করে সর্বনাশা পদ্মার আদি রূপ কিছু দেখছে এবার। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের জন্য নিরীক্ষিত জায়গাগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। হুমকিতে পড়েছে পদ্মা সেতুর এপ্রোচ এলাকা। নড়িয়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন বলতে গেলে নাই হয়ে গেছে। নদীতে বিলীন হয়ে গেছে ৪০০ বছর আগের মুলফতগঞ্জ বাজার। জাজিরার বহু এলাকা।

ইদানিং নতুন আরেক অভিজ্ঞতা মানুষের হচ্ছে, যতই বিপদ আসুক সরকারের কোনো উপস্থিতি যেন চোখেই পড়ে না। ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলতে একটি দফতর যে আছে, সেটি যেন মানুষ ভুলতে বসেছে। অনেক সময় দম্ভ করে কেউ কেউ বলে, ‘ত্রাণ নিয়ে বসে আছি, নেয়ার মানুষ পাই না’। গত দুই চার দশকে রাজনীতি করেই যারা কোটি, শত কোটি কেউ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, মানুষের এত বড় বিপদেও তারা কিছু নিয়ে এগিয়ে আসেন না। গজব আসবে না কেন? অনেক দৈনিক আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নদীভাঙন তুলে ধরায় দেশবাসী জানতে পারছে। ৮ হাজারের মতো পরিবার এবারকার নদী সিকস্তিতে গৃহহীন হয়ে পড়েছে। গৃহহীন বললে হয় না, এখানে বলতে হবে সর্বহারা। কারণ, তাদের তো পায়ের তলায়ই মাটি নেই। মাথার ওপর ছাদের তো প্রশ্নই উঠে না।

আগে দেশে মানবিকতা ছিল, ঝড়, বন্যা বিপদে দেশের মানুষ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে যেত। ইদানিং কোনো মানুষের বিপদকে কোনো মানুষ পাত্তাই দেয় না। এই মন মানসিকতা আল্লাহর গজবের পূর্বাভাস। যে সৃষ্টিকে দয়া করে না, আল্লাহ তাকে দয়া করেন না। যখন কোনো জাতির ওপর গজব আসে এর আগে তার সদস্যদের দিল থেকে দয়া মায়া তুলে নেয়া হয়। শাসকরা মিথ্যা বলে। বড়লোকেরা অহঙ্কার ও উল্লাসে মত্ত থাকে। কোরআন ও হাদীস এ ধরনের বাণীতে ভরপুর।

নদীভাঙন আসলে আল্লাহর তরফ থেকে সবার জন্যই একটি পরীক্ষা। কারও ধৈর্যের পরীক্ষা, কারও মনুষ্যত্বের, কারও দায়িত্বানুভূতির, কারও সঠিক পথে ফিরে আসার। এখানে বহু উপদেশ ও নজিরও রয়েছে। যারা আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতায় বিশ্বাসী নয়, আল্লাহকে প্রকৃত অর্থে বিশ্বাস ও ভয় করে না, যারা বেশি আত্মবিশ্বাসী, তাদের অন্ধত্ব দূর করারও অনেক কিছু আছে এ নদীভাঙনে।

এলাকার জমিদার যাদের ২৫০ বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য আছে, তাদের থাকতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে অন্যের জায়গায়। যারা শত শত মানুষকে খাইয়েছেন তারা এখন খেতে পাচ্ছেন না। ৪/৫টি বহুতল সুপার মার্কেট, বাণিজ্যিক ভবন ও দোকানপাট তলিয়ে যেতে ৩০ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগেনি।

দেওয়ান পরিবারের সহায় সম্পদ, ভিটেমাটি যার আনুমানিক মূল্য দেড় হাজার কোটি টাকা, চোখের পলকে মিশে গেছে ভয়াল পদ্মার গর্ভে। বিলীন হয়েছে ধনী গরিব হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে হাজারো পরিবারের সবকিছু। বহু বছর আগে নদীর গতি-প্রকৃতি বোঝে জ্ঞান ও প্রকৌশল কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো বাঁকে বা স্রোতধারার মুখে বাঁধ নির্মাণ কিংবা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর ভয়ালরূপ মানুষ সামাল দেয়ার চেষ্টা করে। বাংলাদেশে এসবের বালাই কমই আছে। যা আছে তাও ‘কাজির গরু’।

রাজবাড়ী ভাঙন এলাকায় সাধারণ মানুষ মিডিয়াকে বলছে, ‘ওখানটায় বাঁধ দিয়ে সর্বনাশটা করেছে।’ ‘এখানে খনন করে বিপদটা ডেকে এনেছে।’ ‘ওইখানে বাঁধ দিলে এ সর্বনাশ হতো না।’ শুনে মনে হবে জীবন সংগ্রামে অভিজ্ঞ এসব মানুষই বিশেষজ্ঞদের চোখ খুলে দিতে পারেন। নতুন উন্নয়নের চেয়ে শত শত বছরের প্রতিষ্ঠিত জনপদ রক্ষা করা বেশি জরুরি। তাড়াহুড়া করে মোটা অংক বরাদ্দ দিয়ে কিছু লুটেরার অর্থ সম্পদ বৃদ্ধি করার কোনো মানে নেই।

নৌ বাহিনীকে একদিন আগে সরাসরি যে কাজ সোপর্দ করা হয়েছে এবং ১ হাজার কোটি টাকার ওপরে যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যদি সত্যিকার অর্থেই এসবের সঠিক বাস্তবায়ন হয় তাহলে আশা করা যায়, ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপদ সামান্য হলেও কাটিয়ে উঠা যাবে। তবে প্রকৃতির এ খেয়াল যেসব কারণে হয়, তা আল্লাহ এবং তার রাসূল (সা.) স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। এসবে বিশ্বাস ও আমল না করলে শুধু নদী তীরেই নয়, আল্লাহর দুনিয়ার যে কোনো জায়গায়ই এমন পরীক্ষা নেমে আসতে পারে। গজব নাযিল হতে পারে।

মানুষকে বুঝতে হবে, নিজেদের সীমা লঙ্ঘন, জুলুম, মিথ্যাচার, পাপ ও অন্যায়ের প্রতিক্রিয়ায় জলে স্থলে অন্তরীক্ষে দেখা দেয় যত দুর্যোগ। এসবই মানুষের কৃতকর্মের ফল। দুর্যোগ মানুষের অনাচারের কিছু শাস্তি আর সতর্কতা। মূল শাস্তি জমা থাকে পরকালের জন্য। বাঁচতে হলে প্রয়োজন তওবা ও সংশোধনের। আল্লাহ এ মর্মার্থের আয়াতের শেষাংশে বলেছেন, ‘যাতে তারা অনাচার-অবিচার থেকে ফিরে আসে।’ প্রকৃতির রুদ্র মূর্তি মানুষের পাপেরই ফসল। পদ্মার এই সর্বনাশা রূপ এ বিধানের বাইরে নয়।

লিখেছেন: উবায়দুর রহমান খান নদভী
সিনিয়র সহযোগী সম্পাদক,
দৈনিক ইনকিলাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *