পৃথিবীর গোরস্থানে

শেয়ার করুনঃ

সামিরা গোয়েশ্চেল লস এঞ্জেলেসে বসবাসকারী একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার জন্ম ইরানে। আয়াতুল্লাহ খোমেনীর সরকার তার পিতাকে দেশছাড়া করলে সামিরা তার পরিবারের সাথে আমেরিকায় থিতু হন। তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অফ আর্টস ডিগ্রি অর্জন করেন। প্যারিসে অনুষ্ঠিত ‘২০০৬ ইউরোপিয়ান ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে’ তার প্রথম ডকুমেন্টারি ফিল্ম, Our Own Private Bin Laden-কে সেরা বিদেশী ডকুমেন্টারি ফিল্ম এবং সেরা সিনেমা হিসেবে পুরস্কৃত করা হয়। চলতি বছর তিনি রাশিয়ার প্রথম পারমানবিক প্ল্যান্ট নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি নির্মান করেন। এ সম্পর্কে গার্ডিয়ার পত্রিকায় ”The graveyard of the Earth’: inside City 40, Russia’s deadly nuclear secret” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশি হয়। যা পোস্টম্যান এর পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছে অঞ্জন রানা গোস্বামী।

“স্বর্গবাসীদের দু’টি অবস্থা থেকে একটি বেছে নিতে বলা হয়েছিল; সুখ, যেখানে স্বাধীনতা নেই কিংবা স্বাধীনতা, যেখানে সুখ নেই।” ইভগেনি যামিয়াতিন।

চেলিয়াবিনস্ক,উরাল,রাশিয়া। বিস্তৃত উরাল পর্বত এবং তাঁর বনরাজি এক অদ্ভুত মোহের সৃষ্টি করে। এই বনের ভেতর চলতে চলতে এক জায়গায় আপনি বেশ অবাক হয়ে থমকে যাবেন। বিশাল গেট, সশস্ত্র প্রহরী, অতিকায় সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডের ভাষা ইংরেজি এবং রুশ। লাল কালিতে বড় করে লেখা, “Attention!!! ” তারপর নিচে কালো কালিতে আরো কিছু লেখা রয়েছে। বোঝার জন্য একটু কাছে যেতে হবে। কালো লেখার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, “নিয়ন্ত্রিত এলাকা। বিশেষ অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। ” আশেপাশে একটু ঘুরে বুঝতে পারলেন,বহুদূর পর্যন্ত তাঁরকাটা দিয়ে ঘেরা। এরকম সুনসান বনের ভেতর এইরকম কান্ড নিশ্চয়ই আপনাকে অবাক করবে।

খোঁজ নিয়ে জানলেন, এই বিস্তৃত কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা এলাকার নাম “ওজয়রস্ক”। আপনার মনে হাজারো প্রশ্ন। ম্যাপ খুললেন,দেখলেন শহরের নাম-গন্ধটুকু নেই। রহস্য আরো ঘনীভূত হলো। “ওজয়রস্ক ” এক রহস্যের নাম। যার পিছনে রয়েছে রোমাঞ্চকর এক গল্প।

১৯৪৬ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবেমাত্র শেষ হয়েছে। বিশ্বের দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। “অস্ত্র প্রতিযোগিতায় দুই দেশ-ই পরস্পরকে ছাড় দিতে নারাজ। সোভিয়েত প্রশাসন মনে করলেন, যে তাঁরা পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সিদ্ধান্ত হয়, পারমানবিক অস্ত্র উৎপাদনের। ঠিক হলো পুরো ব্যাপারটিই সম্পন্ন হবে অতি গোপনে। এর জন্য দরকার এমন একটি স্থান যেখানে বর্হিবিশ্বের পক্ষে কোনো কিছুই আঁচ করা সম্ভব হবে না। বেছে নেয়া হলো, “ওজয়রস্ক”কে।

ওজয়রস্কের একটি লেকের নাম “ইর্টইয়াশ”। এই লেকের পাড়েই শুরু হলো,প্ল্যান্ট বসানোর কাজ। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রান্ত হতে ডাক পড়লো বিজ্ঞানী এবং শ্রমিকদের। ইর্টইয়াশ লেকের ধারেই তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। এরপর শুরু হলো ব্যাপক কড়াকড়ি। শহরে আসা-যাওয়া তো বন্ধ ছিলই, সাথে সাথে চিঠি লেখা এবং টেলিফোনও বন্ধ হয়ে গেলো। অর্থাৎ, বাইরের পৃথিবীর থেকে ওজয়রস্কের কর্মকান্ড গোপন রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টাই করলো, সোভিয়েত প্রশাসন।

নয়নাভিরাম হ্রদ। সুগন্ধি ফুলের বাগান। আঁকা-বাঁকা রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে গাছের সারি। পার্কে বাচ্চারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। বুড়োরা বেঞ্চে বসে খোশগল্পে মশগুল। মায়েরা শিশুদের নিয়ে ব্যস্ত। তরুনেরা স্কেটিংবোর্ডের সাহায্যে তরুনীদের মুগ্ধ করার চেষ্টা করছে। রাস্তার ধারে হরেক রকম পন্যের পসরা বসিয়েছে দোকানিরা। অনেক মহিলাকে দেখা যাবে ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করতে।

প্রথম দেখায় ওজয়রস্ককে দেখে ১৯৫০ এর দশকের শান্ত কোন আমেরিকান টাউন মনে হয়। কিন্তু প্রকৃত সত্য অনেক বেশি ভয়ংকর- নির্মম। আর ওজয়রস্কের অধিবাসীরা এই নির্মম সত্যটি জানে। তারপরও তাঁরা শহর ছাড়তে অনাগ্রহী। যা পুরো ব্যাপারটিকে আরো বেশি রহস্যময় করে তুলেছে।

“মায়াক নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট”র কাজ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ওজয়রস্কে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে থাকে। ওজয়রস্কবাসী দেখতে পেলো- তাঁদের স্বাস্থ্য দিন দিন খারাপ হচ্ছে, মৃত্যুহার বাড়ছে। কয়েকবছরে মৃত্যুহার বৃদ্ধির সাক্ষী হয়ে আছে তরুণ নাগরিকদের সারি সারি কবর। ওজয়রস্কবাসী জানতো যে, তাঁদের পানি-পানের অযোগ্য, বায়ু দূষিত,ফলমূল বিষাক্ত। তাই তাঁদের রোগশোক বেড়েছে। তাঁরা এও জানতো যে, এইগুলো পারমাণবিক প্রকল্পের প্রভাবেই হচ্ছে। কিন্তু তারপরও তাঁরা শহর ছাড়তে রাজি ছিল না। কেন??

উত্তরটি খুবই মজার। ১৯৪৬ এর ওই সময়টায় সোভিয়েত ইউনিয়নের অধিকাংশ নাগরিকদের জীবনে ছিলো দারিদ্র্য এবং অস্বচ্ছলতা। এইরকম একটি পরিস্থিতিতে ওজয়রস্কের নাগরিকদের জন্য বিলাসবহুল জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা হয়। উন্নত মানের খাবার,আবাসনব্যবস্থা আর ছিলো বিনোদনের প্রাচুর্য। ওজয়রস্কবাসীদের জন্য পৃথিবীতেই একখন্ড “স্বর্গ” তৈরি করেছিলো সোভিয়েত সরকার। তাঁদের বোঝানো হয়েছিলো যে, তাঁরা হচ্ছে সোভিয়েতের, “বাছাইকরা শ্রেষ্ঠ নাগরিক”। একটা সময় এমন একটি চিন্তা দাঁড়িয়ে গেলো যে, “ওজয়রস্কে বাস করাটা আভিজাত্যের ব্যাপার।” এই চিন্তা থেকেই এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরেও ওজয়রস্কবাসী শহর ছেড়ে যায় নি। এমনকি এই মূহুর্তে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত অঞ্চলগুলির একটি হওয়া সত্ত্বেও ওজয়রস্কের অধিবাসীরা এই শহর ছাড়তে নারাজ।

৬ ই অক্টোবর, ১৯৫৭। পূর্ব উরালে কিছু গ্রামের অধিবাসীরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো তাঁদের আবাসভূমি হতে তাঁদেরকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। কেন সরানো হচ্ছে?? সেই সম্পর্কে তাঁদের বিন্দুমাত্র ধারনা দেয়া হলো না। ঘটনার সূত্রপাত সপ্তাহখানেক আগে। কিস্তিম দূর্ঘটনা সম্বন্ধে সবারই কম- বেশি ধারনা আছে। এই “কিস্তিম দূর্ঘটনা “কিন্তু কিস্তিমে ঘটেনি। ঘটেছিলো ওজয়রস্কের মায়াক নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে। ম্যাপে ওজয়রস্কের কোন স্থান না থাকায়, নিকটবর্তী কিস্তিমের নামে দূর্ঘটনাটির নাম হয়।

২৯ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৭। মায়াক নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের একটি ট্যাংক বিস্ফোরিত হয়। বিপুল পরিমান তেজস্ক্রিয় বর্জ্র ছড়িয়ে পড়ে পানিতে, মাটিতে, বাতাসে। ব্যাপকভাবে দূষিত হয় টেচা নদী। প্রায় ৩০০-৩৫০ কি.মি এলাকা জুড়ে তেজস্ক্রিয় মেঘ ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ব উরালের প্রায় ২২ টি গ্রামের মানুষ এর শিকার হয়। তেজস্ক্রিয় মেঘ ছড়িয়ে পড়া এই এলাকাটি East Ural Radioactive Trace (EURT) নামে পরিচিত।

যথারীতি, তৎকালীন সোভিয়েত সরকারের ব্যাপক সেন্সরশিপের মুখে এই ঘটনার অনেক কিছুই তখন জানা যায় নি। ১৯৭৬ সালে জোরেস মেদভেদেভ নামের এক ভদ্রলোক এই সম্বন্ধে আমাদের অবগত করেন। কিস্তিম দূর্ঘটনার সুদীর্ঘ প্রভাব পড়ে পূর্ব উরালের জনজীবনে। রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় বলছে, ১৯৪৬-১৯৯২ সময়কালে ওই এলাকায় তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে ৮,০১৫ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে।

ওজয়রস্ক এবং তাঁর আশেপাশে দূষণের হিসাবটা আপনাকে আতংকিত করার জন্য যথেষ্ট। “মায়াক নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট”থেকে আশেপাশে নদী এবং হ্রদে বিপুল পরিমান তেজস্ক্রিয় বর্জ্র ফেলা হয়। যাঁর পরিমান প্রায় ২০০ মিলিয়ন কুরী। পরিমানটা চেরনোবিলের তুলনায় প্রায় ৪ গুন। গত চার-পাঁচ দশক ধরে এসব বর্জ্র আশপাশের হ্রদ-নদী হয়ে আর্কটিক সাগরে মিশেছে। যথারীতি কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করেছে। ওই এলাকার একটি হ্রদ এতটাই দূষিত যে তাঁর নামই হয়ে গেছে, “মৃত্যুর হ্রদ/প্লুটোনিয়াম হ্রদ”।

ওই হ্রদের বিকিরণের মাত্রা প্রায় ১২০ মিলিয়ন কুরী। যা চেরনোবিলের তুলনায় প্রায় ২.৫ গুন। গবেষকদের ভাষ্যমতে ওজয়রস্ক এবং তাঁর অধিবাসীরা, চেরনোবিলের অধিবাসীদের তুলনায় ৫ গুন বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কিন্তু, ওজয়রস্কবাসীর তাতে কিছু আসে যায় না। তাঁদের কাছে চিরদিনের মতন ওজয়রস্ক ছাড়ার অপশন থাকলেও খুব কম লোকই তা করে। এমন আরামের জীবন কে ছাড়তে চায়??

স্থানীয় এক সাংবাদিকের মতে,” বাইরের পৃথিবী তাঁদের নিয়ে কি ভাবছে, তাঁরা তা জানে না। জানার চেষ্টাও করে না।” ওজয়রস্কবাসী তাঁদের আবদ্ধ স্বর্গ নিয়েই খুশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *