তিস্তা ব্যারেজ কেন আন্তখাল সংযোগ প্রকল্প?

শেয়ার করুনঃ

১.

চলতি বছরের জুনের ২১ তারিখ নদী বিশেষজ্ঞ শফিউদ্দীন সরকারের পরামর্শে দুই নদী প্রেমিক তরুণ গঙ্গাচড়ার হীরন্ময় ও কুড়িগ্রামের জাহানুরসহ রংপুর মেডিকেল মোড় থেকে সৈয়দপুর হয়ে দিনাজপুরের দশমাইল পর্যন্ত একটি জরিপ পরিচালনা করেন। এই মহাসড়কটি পূর্ব থেকে পশ্চিমে চলে গেছে। এর উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে যতগুলো নদনদী ও খাল প্রবাহিত হয়েছে, সবই এই সড়ককে অতিক্রম করে গেছে। তাই সহজেই নদনদী ও খালের সংখ্যার ধারণা পেতে সক্ষম হই। ফলে ঘাঘট নদ থেকে শুরু করে বরাতি, যমুনেশ্বরী, ছোট যমুনা, করতোয়া, পুনর্ভবা, আত্রাইসহ মোট ৪১টি নদনদী, তাদের শাখা-প্রশাখা ও তিস্তা ব্যারেজের বিশাল ৬টি খাল আমরা অতিক্রম করি।এই বর্ষা মৌসুমে সব নদনদী ও তাদের শাখাগুলো পানিতে টইটুম্বুর থাকলেও বিশাল খাল ছয়টির মাত্র দুটিতে হাত দুয়েক করে পানি দেখেছি, বাকি চারটি খটখটে শুকনো।জীবনানন্দ দাশের কথা মনে পড়ে- ‘নদী কেন বেঁচে থাকে? -একদিন এই নদী -শব্দ করে হৃদয়ে বিস্ময়/ আনিতে পারে না আর; -মানুষের মন থেকে নদীরা হারায়-শেষ হয়।’

আলো আর আকাশের থেকে নদী যতখানি আশা করে, আমরা নদীর সেই আশার সমাধি ঘটিয়ে বলি- গাছ, পাহাড়, রোদ, তারা, মেঘ ও আকাশ তোমার তরে নয়। বরং সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত শুষে নেওয়ার মতো করে খাল দিয়ে তোমার জলের গর্জন শুষে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছি, উজানে সড়ক নির্মাণ ও উত্‍সমূলকে আটকে দিয়ে শাখা নদীগুলোকে হত্যা করার পথ চূড়ান্ত করেছি; তবুও নদীগুলো বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যায় জোয়ারের পানি ও বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে। রংপুর থেকে দশমাইল পর্যন্ত ৪১টি নদনদী যেভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টায় আছে-গলিত স্থবির ব্যাঙ যেভাবে আরো দুই মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে আরেকটি প্রভাতের ইশারায়!

২.

এত বিশাল বাজেটের আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার ফল এই শুকনো খাল? নদীর ভূমিকা যেমন সমস্ত গতিপথে ভূত্বকের চরিত্র বুঝে নিয়ে ও তার পানির উত্‍সকে পুনঃসঞ্চালিত করা এবং পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বৈরী প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত না করে উচ্চ বৃষ্টিপাত এলাকা থেকে পানি সরবরাহ করা। কিন্তু খালগুলোর বেলায় তা হয় না। উল্টো ৩০ ভাগ বাষ্পীভবনসহ ভূত্বকের পানি শুষে নেওয়ার কারণে সিংহ ভাগ পানি হারিয়ে যায়। প্রাকৃতিক গতিপথ থেকে পানির গতিপথ পরিবর্তনের ফলে ভাটি অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানি উৎসের পুনঃসঞ্চালন বাধাপ্রাপ্ত হয়। অথচ বড় বড় বাঁধ ও বৃহৎ সেচ প্রকল্পগুলো দাঁড়িয়ে আছে এই ধারণার ওপর যে, এতে পানির ব্যবহার আরো বৃদ্ধি পাবে এবং পানির চাহিদা স্বাভাবিক পানিচক্রের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।

নদীর প্রতি কোনো বৈরী ব্যবহার ছাড়াই আমাদের নদী তীরস্থ সমাজ নদীর পানি ব্যবহার করত যুগ যুগ ধরে। পানি সংরক্ষণ ও বিতরণ হতো প্রাকৃতিক নিয়মেও ব্যবহার হতো প্রাকৃতিক পানিচক্রের সাথে খাপ খাইয়ে। আমরা ভেবে অবাক হয়েছি, ৪১টি নদনদী ও তাদের শাখা-প্রশাখা থাকতে ছয়টি খালের কী প্রয়োজন পড়ল? যদি রাষ্ট্রীয় যত্নের মাধ্যমে লোকজ জ্ঞান ব্যবহার করা যেত, কোনো খরচ ছাড়াই সেচ কাজ চালানো ও মাছের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব ছিল।

৩.

তিস্তা ব্যারেজ যে ব্যর্থ প্রকল্প, তা আর নতুন করে বলার নেই। হাজার হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে যে খালগুলো খনন করা হয়েছে, তা পতিত স্থাপত্যের নজির সৃষ্টি করেছে। উল্টো বর্ষা মৌসুমে ব্যারেজের ভাটিতে ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি করেছে। হাতিবান্ধা ও ডিমলা এলাকার জনগণ শুকনো মৌসুমের চেয়ে বর্ষা মৌসুমে অধিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে নদীর প্রাণ যে পানিচক্রের সাথে যুক্ত, তার সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে জলবিজ্ঞানচক্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রায় অর্ধ শতাধিক নদনদী ও তাদের শাখাগুলোর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে। অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর ছল ছল শব্দে জেগে উঠব না আর।

আমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে ভারতের যে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের বিরোধিতা করি, তা তো খালের সাহায্যে নদীর সাথে নদীকে মেলানো, কথিত ‘বেশি’ পানির নদীগুলোর সাথে ‘কম’ পানির নদীগুলোকে জুড়ে দেওয়া। আর আমরা? নদীর পানি খাল থেকে খালে ছড়িয়ে দিচ্ছি -যা আরো বেশি একান্ত নদী অববাহিকার পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য যা নদীর নিয়মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; যা স্রেফ শরীর থেকে রক্ত বের করে নেওয়া। নদীর পানি বইতে দেওয়া নয়, স্রেফ শুষে নেওয়া। প্রাকৃতিক নদীর বিকল্প হিসেবে মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে নিয়ন্ত্রিত ও ব্যবহৃত। ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের মতো এটা ঠিক বাংলাদেশের আন্তখাল প্রকল্প। আমরা কি কবি আহসান হাবীবের ‘এক উধাও নদীর মুগ্ধ এক অবোধ বালক’ হয়ে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের মতো আন্তখাল প্রকল্পের বেলায়ও চুপ করে থাকব?

লেখক : নাহিদ হাসান নলেজ

প্রধান সমন্বয়ক, রেল-নৌযোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *