আল মাহমুদ থাকবেন তার কবিতাগুলো দিয়ে

শেয়ার করুনঃ

কবি আল মাহমুদ মারা গেলেন, সব জায়গা আল মাহমুদময়। মানে উনার জীবন সফল, সম্ভবত আরও শ’খানেক বছর উনার নাম উচ্চারিত হবে। কালকের আগপর্যন্ত আল মাহমুদ সম্পর্কে আমার জানাশোনা ছিল, উনি সোনালী কাবিন নামের একটা বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ লিখছিলেন, আর স্কুলের বাংলা শিক্ষক শাহরিয়ার সুলতান স্যারের মুখে শোনা উনার দুইটা লাইন, “সোনার হাতে সোনার কাঁকন, কে কার অলংকার…”, এটুকুই। আরও কিছু ভাসা ভাসা বক্তব্য চোখে আসতো, সেসব থেকে মনে হয়েছে উনি জামাতী।

সপ্তাহ দুয়েক আগে একটা খবর পড়ছিলাম, হিটলারের চিত্রকর্ম নিলামে অনেক দামে বিক্রি হয়েছে। তথ্যটা জেনে আগ্রহ জাগলো হিটলারের চত্রকর্মের নমুনা দেখার। অনেকগুলো খুঁজেও পেলাম, অনেক সময় নিয়ে একে একে দেখলাম। চিত্রকর্মের মান আর নানা ব্যাপার আমার মাথার উপর দিয়ে যায়, সেভাবে বুঝি না। কিন্তু যা দেখলাম, তাতে হিটলারের চিত্রকর্মগুলোকে কালজয়ী কিছু মনে না হলেও উন্নত শিল্পকর্মই মনে হয়েছে। মনে হয়েছিল, উনি হয়তো জাত শিল্পী ছিলেন, যিনি তার ভালোবাসার ক্ষেত্র থেকে সরে এসেছিলেন। তাই হিটলারের হিটলার হয়ে যাবার পরেও উনার শিল্পকর্ম শিল্পকর্মই থেকে যায়, তার যে মূল্য কিংবা প্রকৃত উৎকর্ষ, সেটা হারায় না। আল মাহমুদের ক্ষেত্রেও আমার এই মুহূর্তে একই মনোভাব।

তার বেশ কয়টা কবিতা পড়লাম। প্রথম আলোর রিপোর্টের ভিতর পেলাম উনার সোনালী কাবিনের প্রথম সনেট, যা অনেক উন্নতমানের, অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। ফেসবুকে লুনা রুশদীর শেয়ার করা আরেকটা কবিতা পড়ে নিজেও শেয়ার করলাম, সেটাও অসাধারণ। মার্জিত, মেদহীন কিন্তু আবেদনময়। যে কয়টা কবিতা পড়লাম, স্বল্পজ্ঞানে সেগুলোকে খারাপ বলার কারণ নাই, উলটা বলতে হবে অনেক আমি তুমিময় খ্যাতিমান কবির চেয়ে অনেক ভাল। এমনকি সবকিছুর পর কবিতার বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের চেয়েও আল মাহমুদ বেশি শক্তিশালী বলেই মনে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কমপ্লিট প্যাকেজ, আল মাহমুদ মূলত কবি। তার কবিতার অলংকার, আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য, আঞ্চলিক শব্দ দিয়ে উপমা কিংবা বাক্যের কারুকাজ, এসব বেশ সাবলীল ও আকর্ষক নিজ প্রজন্মের কবিদের বিবেচনায়। একবিংশ শতকে এসে বাংলা কবিতার ধারা কিছুটা নয়, অনেকটা পাল্টে গেছে যা অন্য আলোচনা।

আবার যেহেতু তিনি একজন বিতর্কিত মানুষ কিংবা কবি, তাই বিতর্কটা আসলে কেন এসব নিয়েও পড়ছিলাম। সোনালী কাবিনের পরে তার বিবর্তন নিয়ে টুকটাক পড়লাম, বখতিয়ারের ঘোড়া থেকে টুকটাক পড়লাম। বিবর্তন তো মানুষেরই হয়। আমি নিজেও তো নামাজ রোজা করা ঈমানদার বান্দা থেকে ধর্মহীনতার পথে নিজেকে বিবর্তিত করছি। “রোজা করি, নামাজ পড়ি, মসজিদে যাই চলে” টাইপ ছড়া লিখেছি স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য। আবার এখন অনেক কিছুতেই ঈশ্বরকে একটা চরিত্র বানাই, যিনি কখনো ভিলেন, আবার কখনো পিতার মত উদার, মাতার কাছাকাছি মায়াময় কেউ হয়ে যান। তো তিনিও যখন যেই বিশ্বাসে অবসেসড ছিলেন, সেটা তার সৃষ্টিতে আসতেই পারে, কিংবা কেবল সৃষ্টির জন্য কল্পনা থেকেও হতে পারে। এসব যারা নিজেরা সৃষ্টিশীল না, তাদের পক্ষে বোঝা কঠিন। বোঝা কঠিন যে, নিজে যা বিশ্বাস করিনা কিংবা যেমন নই, সেটাকেই জাস্টিফাই করছি এমনরুপে লেখা সম্ভব। শুধু সম্ভব না, এমনটাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয়। আর কবিতা তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশুদ্ধ ফিকশন, মানে কল্পনা।

মানুষ হিসেবে তার নানা স্বত্বা থাকতে পারে। কবি স্বত্বা কিংবা রাজনৈতিক কিংবা অন্যকিছু। কবিতার বিবেচনায় উনি বিশুদ্ধ কবিই ছিলেন। কিন্তু পেশাগত ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক আদর্শের ক্ষেত্রে উনার বার বার সরে আসার ব্যাপারগুলোও পড়লাম। এসব তো হয়ই। তীব্র মুজিব বিদ্বেষী জাসদের হাসানুল হক ইনু এখন এক বাক্যে বঙ্গবন্ধুর নামের আগে ১০টা বিশেষণ ব্যবহার করতে পারলে উনার সুইচিং টেন্ডেন্সিই কেন কেবল এত আলোচনার বিষয় হবে? জামাতের দিকে গেছেন বলে? সে ব্যাপারেও ভিডিও দেখলাম, এত গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই সেটায়। মানুষই তো উনি। দল হিসেবে জামাতকে আর মানুষ হিসেবে জামাতীদের আমি ভয় পাই। কিন্তু জামাত সমর্থক হইলেই কেউ যে খারাপ হবেন তেমনটাও ভাবি না। একেকজন মানুষ একেকভাবে বেড়ে উঠে, তাদের ভিতরে বিশ্বাসের ভিত্তি দাঁড়ায় নানা অদ্ভুত প্যাটার্নে। কাউকে সমর্থন করা অপরাধ না, অপরাধ সেটাই যা আইনবিরুদ্ধ হয়। আর এজন্যই যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচার হচ্ছে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, কেবল তাদের। সমর্থনের দায়ে বিচার করলে এখনই যদি তাদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়, এরপর বঙ্গোপসাগরে তাদের লাশ ফেলে দেয়া হয়, বাংলাদেশের ভূমির আয়তন বেশ কয়েক বর্গমাইল বেড়ে যাওয়ার কথা। আমরা একটা কথা ভুলে যাই, ৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ল্যান্ডস্লাইড বিজয়ের পরেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ভোটের ২৫-৩০% পাকিস্তানপন্থী দলগুলো পেয়েছিল। এই মানুষগুলো কি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পক্ষের কেউ ছিলেন? সম্ভবত না। আল মাহমুদ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি ছিলেন না সেটা আমি জানিনা। কিন্তু সে সময় পর্যন্ত তাঁর অতীত বলে তিনি বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পক্ষেরই কেউ ছিলেন। উনি হয়তো রাজাকার সাইদীর ওয়াজ শুনেই সাইদী ভক্ত হয়েছিলেন, ৭১ এ সাইদী কী ছিলেন উনি সেটা জানতেন না। আমরা অনেকেই যেমন জানিনা আজকে প্রিন্স মুসা বিন শমসের কী ছিল ৭১ সালে, কত বই আর দলিলে সরাসরি এই লোকের নাম আছে। হয়তো সেসব বই কিংবা দলিল সম্পর্কে অবগত নন বলেই মুসা সাহেবের পুত্রের সাথে স্পন কন্যার বিয়ে দিয়েছেন এমন কেউ, যিনি “শতভাগ” দেশপ্রেমিক নেতা।

যাইহোক, এরপর উনার নিজ সাক্ষাৎকারের বক্তব্যেই উনাকে বঙ্গবন্ধু, জে: জিয়া, জে: এরশাদের স্তুতি করতে দেখা যায়। এটাই সরে সরে আসা, সম্ভবত কোনো আদর্শে তিনি স্থির ছিলেন না। মানুষ এরকম হতেই পারে। উনার মুখেই আসছে উনি রাষ্ট্র থেকে তেমনকিছু পান নাই।
আবার নিজেই বলছেন সরকারের দেয়া জমি উনি ১ কোটি ৬০ লাখ টাকায় বিক্রি করে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালিয়েছেন। এত টাকা বাংলাদেশের হিসেবে কম কথা না। আর পদক ও পদ প্রাপ্তির হিসাব তো ব্যাপক। তাও পাইলাম না পাইলাম না বলে এই অকপট আহাজারি বলে দিচ্ছে, যে উনি সাধারণ মানুষ ছিলেন। আবার কবি সাহিত্যিকদের অনেকের মনে কিছুই পাইলাম না, কেউ আমার মূল্য দিলোনা, এইরকম আহাজারি একটু বেশিই দেখা যায়। নির্মলেন্দু বাবুকেও আমরা যেমন দেখেছি, কান্নাকাটি করতে পদকের জন্য। এসব খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার, গুণী মানুষদের ক্ষেত্রে দেখা গেলে একটু দৃষ্টিকটু লাগে, এই যা।

আল মাহমুদের কবিতা নিয়ে এবং আল মাহমুদ নিয়ে যেহেতু আমার নিজের আলাদা কোনো মাতামাতি নাই, যা লিখছি, তাও সবাই বলছে অনেককিছু, তাই নিজেই কিছু বলার জন্য। সেহেতু, আমি কেবল উনার কবিতা দিয়ে উনাকে বিচার করব। বাংলাদেশের রাজনীতিতে উনার আলাদা মূল্য তেমন নাই। যারা উনার আদর্শ কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে অনেক লিখছেন, তাদের একেকজনও ব্যক্তিগত জীবনে কেমন হিপোক্রিট, তার অনেকটাও আমার জানা। তবে সময় বয়ে যাবে, আরও অনেক সময়। আল মাহমুদ থাকবেন তার কবিতাগুলো দিয়ে, একজন সফল ও শক্তিশালী কবি হিসেবেই। উনাকে নিয়ে বিতর্কের তখন তেমন মূল্য থাকবে না। মৃত মানুষ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার মূল্য রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক কম।

লিখেছেন: শরীফ তমাল
কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *