মানুষের জন্য কবিতা-কবিতায় মানুষ

শেয়ার করুনঃ

বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র এখন একটি কর্পোরেট সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি হয়ে পড়েছে। তারা বিষয়টিকে এমন এক প্রলেপ দিয়ে রেখেছে, যাতে সাহিত্য তার মৌলিক গতিপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে শোষক শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে পড়ে। সেই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে বহু আগে থেকে। ইউরোপ অপর পৃথিবীকে তথাকথিত “আলোকিত” করার মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু করে। ঊনবিংশ শতকে এসে, এই কর্পোরেটোক্রেসি এমন নিষ্ঠুর কায়দায় তার কর্মযজ্ঞ সম্পাদনা করে; যেখানে মানুষ কিছু বুঝে নেওয়ার আগেই তাতে ঘায়েল হয়ে পড়ে। অবাক করার বিষয় হলো কর্পোরেটোক্রেসি টার্গেট করে বসে সংবেদনশীল-সৃষ্টিশীল অগ্রসর মানব পুত্রদের।

তাদের উদারনৈতিকতার মধুর খপ্পরে পড়ে, শোষিত মানুষের পক্ষে যাদের কথা বলা প্রয়োজন; তারাই চিরতরে নিরব হয়ে যায়। আর কর্পোরেটোক্রেসির সেবাদাস হয়ে পড়ে। যাদের সৎ উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের সেবা করবে, তারাও আর ফিরে আসতে পারে না। কর্পোরেট টাকার লোভ দিয়ে, ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা বলে তাদের মননে সাম্রাজ্যবাদি ডকট্রিন ঢুকিয়ে দেয়। তারা হয়ে পড়ে অসহায়। আবার অনেকে কর্পোরেটের এই ইতরামিকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ মনে করে নিজেই হয়ে পড়ে এর কর্তা। এভাবে মানব জাতির উন্নত জীবনের দিকে যাত্রাকে কর্পোরেট তার কৌশল দিয়ে ধ্বংস করে ফেলে। মানুষের উন্নত ও রুচিশীল জীবন যাপনের জন্য অনেক বড় সুযোগ ছিল। কর্পোরেট সেই সুযোগ সম্পূর্ণভাবেই নষ্ট করে দিয়েছে। কর্পোরেটের বাইবেল হচ্ছে তার মিডিয়া। মিডিয়ায় তারা মানুষকে হিরো বানানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে। আজকে যাদেরকে তারা সেলিব্রেটি নাম দিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির পণ্য বিক্রির নট-নটী বানিয়েছে, তাদের তো এটা হওয়ার কথা ছিল না। তাদের হওয়ার কথা ছিল একজন অভিনেতা, অভিনেত্রী। মানুষের মুক্তির জন্য শিল্প-জীবনকে উৎকর্ষের ঐশ্বর্যে বলবান করা। সেখানে আজকের চলচ্চিত্রকে ইন্ডাস্ট্রি বানিয়ে হিরোইজম চালু করে মানব জাতির কি লাভ হয়েছে সেটা দেখতে হবে। বরং অনেক প্রতিভাবান মানুষের জীবনকে তারা নষ্ট করে দিয়েছে।

কিছু মুনাফাখোরদের লোভের কাছে বলি হয়েছে মানব জাতির বীর সন্তানগণ। যারা পৃথিবীকে বদলে দিতে পারতো নতুন আঙ্গিকে, নতুন সম্ভাবনায়। তারা তাদেরকে হিরো বানিয়েছে, আবার জিরোও বানাচ্ছে। মি টু যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।মহাভারতের দ্রেীপদীর বস্ত্রহরণের চেয়েও এ এক ভয়াবহ খেলা।

বিশ্ব এখন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সেবাদাস। তাদের অগ্রসর সন্তানগুলোও বিবেচনাহীনভাবে তাদের প্রচার-প্রসার করে যাচ্ছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া, চিন, জাপান, কোরিয়া, আফগানিস্তানসহ পৃথিবীর কোন দেশটি এর বাইরে?

বাংলাদেশের সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ রাজনীতিতে এই আগ্রাসন এমনভাবে হচ্ছে, তা দেখে যে কোনো মুক্তিকামী মানুষ শিউরে না ওঠে পারবে না। ভাবতে বাধ্য হবে, এ কোন দেশ, এরা কারা খ্যাতির মোহে লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বসেছে। এদের বাবা, দাদা, পিতামহরাই ছিল এদেশের শোষিত মানুষ কৃষক, জেলে, কাঠমিস্ত্রী, কামলা ইত্যাদি। পাঁচ প্রজন্মের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এমন কি গলদ, যে নিজেরাই কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বানিয়ে নিজের দেশের মানুষকে শোষণ করে যাচ্ছে? পৃথিবীর মানুষকে বিপদে ফেলে নিজের ও নিজেদের সন্তান-সন্ততীদের নিরাপদ আবাসন তৈরি করছে। এরা বুঝতেই পারছে না, তারাই পরমাণবিক বোমার শিকার হবে একদিন। পৃথিবীর দেশে দেশে এতগুলো পরমাণবিক বোমা মজুদ রেখে মনে করছেন তারা নিরাপদ।

শতাব্দীর এ রোগকে এই সময়ের সন্তান হিসেবে আমাদের শনাক্ত করতে হবে। সেই অনুযায়ী রোগের চিকিৎসাও করতে হবে।

অবাক বিষয় আজকের দুনিয়া কর্পোরেট কমরেড দিয়ে ভরে যাচ্ছে। কর্পোরেট কমরেডগণ কর্পোরেটোক্রেসির ছাতার নিচে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। তাই সময় এসেছে এখন সত্য কথা বলার। সচেতন কবি লেখক সাহিত্যিক চলচ্চিত্রকার সাংস্কৃতিককর্মী হিসেবে আমাদের সেই সত্যকে উদ্ধার করতে হবে। আজকে যারা নিজেদের বামপন্থী বলে দাবী করছে তাদেরকে আমরা কর্পোরেট বাম বলতে পারি। যারা জীবনকে বাজি না রেখে মানুষের মুক্তির কথা বলে নিজেদের ফায়দা লুটছে। এইসব কর্পোরেট বাম আর কর্পোরেট উদারনৈতিক ডানপন্থীগণকে রুখে দিতে হবে।

সভ্যতার ক্রমবিকাশকে মানবিক সুন্দরে ভরে দিতে হলে এর বিকল্প নেই। তাই বন্ধুগণ, আমরা এক অনষ্ঠানের ডাক দিয়েছি। যার নাম দিয়েছি মানুষের জন্য কবিতা-কবিতায় মানুষ।

আমরা কথা বলবো নগরের রিক্সাওয়ালা, চূলার আগুনে মুখ পুড়ে যাওয়া বুয়া, ভারী রড-সিমেন্ট বহন করতে করতে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া রাজমিস্ত্রী, ফুটপাতের দোকানদার, পতিতালয়ে অমানবিক জীবন যাপন করে যাওয়া বোন, পেটিবুর্জোয়া বাসনা বুকে নিয়ে, কর্পোরেটদের সমস্ত অন্যায় সহ্য করে; সদ্য চাকরিতে ঢুকে পড়া ছাত্র-ছাত্রী ভাইবোন তাদের জন্য। আমরা শিল্প রচনা করবো এদেশের মৃত্তিকা সঞ্জাত কঙ্কালসার কৃষকের, শ্রমিকের, জেলেদের জন্য। ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর জন্য আমরা কথা বলবো। আমাদের শিল্পজীবন হোক তাদের জন্য নিবেদিত।
বহুজাতিক কোম্পানি পণ্যের দাম এমন কৌশলে বাড়িয়ে তুলছে তা অনুভব করলে বেঁচে থাকা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষের বেঁচে থাকাকে যারা কৌশলে কঠিন করে দিচ্ছে , যারা অস্ত্র বানাচ্ছে, মানুষকে ভয় ও শঙ্কার মধ্যে রেখে ফায়দা লুটছে, তাদেরকে কিভাবে আমরা মানুষ বলবো? তারা তো মানুষের মুখোশ পরা দানব।

এসব দানবদের বিরুদ্ধেই আমাদের যুদ্ধ। আমাদের এত বথা বলা। সে ধার্মিক হলেও কি? বামপন্থী হলেও কি? জ্ঞানী হলেও কি? দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য।

নজরুলের ভাষায় বলতে পারি, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে’
সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশে নতুন সকালের জন্য আমাদের জাগতে হবে। আমাদের জাগতেই হবে।

বন্ধুগণ, এই বিষয়কে সামনে রেখে আগামী ১০ নভেম্বর, শনিবার, বিকেল ৪.৩০ টায়, শাহবাগ, ‘মানুষের জন্য কবিতা-কবিতায় মানুষ’ শীর্ষক একটি প্রতিবাদী কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে বিপ্লবী লেখক আন্দোলন, বাংলাদেশ।
আপনাদের উপস্থিতি কামনা করছি।

লিখেছেন: মনির ইউসুফ
সম্পাদক,
কবিতার রাজপথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *