গল্প: বাবার উইল

শেয়ার করুনঃ

বালিশের নিচে চাপা পড়া মোবাইল ফোনটা মধ্যরাতে হঠাৎ গোঁ গোঁ করে কেঁপে উঠলো। ঘুমে হাবুডুবু চোখ দুটো অনেক কষ্টে খুললাম। চিনির এসএমএস। আমার ঘুম ছুটে গেল এক লহমায়। এক শ এক কাঠুরে কুঠার চালাতে লাগলো হৃৎপিণ্ডের গোড়ায়। কখন হাতটা উঠে গেল কপালে টের পেলাম না।

পাগলীটার ক্ষুদেবার্তায় স্পষ্ট মন খারাপের ইঙ্গিত। এই রাত তিনটায় কী হলো ওর!

এই এক পরম বিস্ময়, চিনির কিছু হলে আমার সমস্ত পৃথিবী দুলে ওঠে। ওর মন খারাপ দেখলে আমার বুকের কীনারে শত সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে। ওর ছোট ছোট চোখ জোড়ায় একবিন্দু বিষণ্নতা দেখলে আমার হৃদয়ের পাটাতনে একসাথে এক হাজার বৃশ্চিক ছোবল দেয়।

আমি জানি না কেন এমন হয়। অথচ কে না জানে, ওর সঙ্গে আমার প্রেম জাতীয় কোনো সম্পর্ক নেই।

আমি বিছানা থেকে উঠে বসে ওর ফোন নম্বরে ডায়াল করি। এই মুহূর্তে আপনার…। ফোন বন্ধ। বাকি রাত আর ঘুম হলো না। সারা রাত চেষ্টা করে গেলাম। একবারের জন্যও ফোন খোলা পেলাম না।

পরদিন পরীক্ষা। ভার্সিটি গেলাম। পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা শেষে বন্ধুদের আড্ডায়ও শরিক হলাম। রতন যথারীতি প্রস্তাব দিল, আজ পরীক্ষা ভালো হইছে মামা, চল পিনিক হয়ে যাক!

রতনের এই এক সমস্যা। পরীক্ষা ভালো হলেও ওর পিনিক চাই, পরীক্ষা খারাপ হলেও চাই। আকাশ মেঘলা থাকলেও পিনিক চাই আবার আকাশে রোদ থাকলেও পিনিক চাই। ও বলে, তোরা এমন করিস ক্যান মামা? পিনিক নিই তো মাত্র দুই দিন-যেদিন বৃষ্টি হয় সেদিন আর যেদিন বৃষ্টি হয় না সেদিন।

মেহেদী শোভনরা এ নিয়ে হাসাহাসি করলো। তারপর আমাদের সামনে দিয়ে দুজন সহপাঠী হাত ধরাধরি করে যাচ্ছিল, তাদেরকে টিপ্পনি কাটলো ওরা। ওদের হাত বন্ধুর হাত নাকি প্রেমিক প্রেমিকার হাত তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হলো। মিন্টু বললো, তোরা তর্ক করতে থাক, আমি একটু আসি। বলে ও দ্রুত হেঁটে গিয়ে ওই হাত ধরাধরি করা দুজনকে ধরে ফেলল। বলল, এটা ভার্সিটি, অশ্লীলতা করার জায়গা নয়। তোর জরিমানা হইছে। মানিব্যাগটা বাইর কর দেখি।

ছেলেটা অসহায়ের মতো মানিব্যাগ বের করে মিন্টুর হাতে তুলে দিল। মিন্টু অভদ্র নয়। অশ্লীলতা জানে না। মানিব্যাগে দশ-বিশ টাকা রেখে বাকিটা নিজের পকেটে ভরলো। তারপর মানিব্যাগটা ছেলেটার হাতে দিয়ে বলল, ক্যাম্পাসে যেন আর এসব না দেখি।

মিন্টু সব কয়টা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে আমাদের আড্ডায় ফিরে এলো। রতন আনন্দে চিৎকার করে উঠলো, আজ পিনিক হবে রে, পিনিক…!

আমি এদের সঙ্গে থেকেও যেন একা থাকলাম। আমার মনের মধ্যে সারাক্ষণ চিনি বসে থাকলো। বন্ধুদের চোখ আড়াল করে একটু পর পর ফোনে ডায়াল করে গেলাম। ওই একই কথা, এই মুহূর্তে…।

ভার্সিটি থেকে বের হতে হতে দুপুর গড়িয়ে গেল। আমি সোজা টিউশনিতে যাওয়ার উদ্দেশে বাসে উঠলাম। ছাত্রের বাসায় গিয়ে তার মুখোমুখি হয়ে আক্কেল গুড়ুম আমার।

আমার ছাত্রের মন খারাপ। ও আজ পড়বে না। বলল, আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত অবস্থায় আছি স্যার। আমি বললাম, কী হয়েছে বর্ণ, হৃদয়ঘটিত ব্যাপার স্যাপার নাকি?

জি স্যার, জি স্যার…। বর্ণ ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ওর সাথে আমার ব্রেক আপ হয়ে গেছে স্যার।
আমি ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া টিকটিকির মতো কয়েক সেকেন্ড নড়তে পারলাম না। বলে কী এই ছেলে? সবে পড়ছে স্ট্যান্ডার্ড ফোরে, এর মধ্যেই একবার ব্রেক আপ হয়ে গেল!

আমি শালা বুড়ো ধাই, অনার্স শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ আজ পর্যন্ত একটা প্রেমই করতে পারলাম না। বর্ণ ফোপাতে ফোপাতে বলেই যাচ্ছে, মেয়েদের বিশ্বাস করবেন না স্যার। ওরা খুব হারামী হয়… ইত্যাদি।

আমি বর্ণকে সান্তনা দিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। ফোন বের করে আবারও চিনিকে ডায়াল করলাম। নাহ্, এখনো বন্ধ। আমি কলা বাগান থেকে হেঁটে হেঁটে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে এলাম।

এখানে দেখি ফুটপাতের ওপর সুন্দর সুন্দর চটি স্যান্ডেল নিয়ে বসেছে এক হকার। উদ্দেশ্যহীনভাবেই একজোড়া হাতে নিয়ে বললাম, মামা, দাম কত?

এক শ আশি ট্যাকা মামা।

আমি জানি, এরা এক শ আশি টাকা দাম চায়, দেড় শ টাকা হলে দিয়ে দেয়। আমি তাই না নেওয়ার জন্যই বললাম, এক শ টাকায় দেওয়া যাবে?

এইডা একটা দাম কইলেন মামা? এক শ ট্যাকায় তো কিনতেও পারি নাই।

‘ঠিক আছে, রাখেন তাহলে’ বলে আমি চলে যেতে উদ্যত হই। হকার এবার পিছু ডাক দেয়, ‘লইয়া যান, মামা।’
মানিব্যাগ বের করে দেখি, সব পকেট মিলে এক শটি টাকাই আছে। কি বিপদ! এই টাকা শেষ হয়ে গেলে আমি চলব কী করে? টিউশনীর টাকা হাতে আসতে এখনো সপ্তাহখানেক বাকি।

নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বোকা বলে মনে হচ্ছিল। কাছে আয়না নেই বলে এই মুহূর্তের বোকা বোকা চেহারা দেখে রাখতে পারলাম না। আফসোস!

মানিব্যাগের সব টাকা হকারের হাতে তুলে দিয়ে ভাবতে লাগলাম, এখন কী করা যায়। ভাবতে ভাবতে সঞ্জুকে ফোন দিলাম। উদ্দেশ্য, ওর কাছ থেকে কিছু অর্থ লোন নেওয়া।
হ্যালো, সঞ্জু, তুই কই?

আমি লালমাটিয়া যাচ্ছি একটা কাজে। তুই কই?

আমি ৩২ নম্বরে।

তুই তাহলে ওখান থেকে ২৭ নম্বর ঘাটে এসে বস। আমি কাজ সেরে আসছি।

আধা ঘন্টা পর সাতাশ নম্বর লেকপাড়ে আমার আর সঞ্জুর সাক্ষাৎ হলো।

‘বাহ্, হেব্বি স্যান্ডেল কিনছিস তো।’ আমার সদ্য কেনা স্যান্ডেল দেখে সঞ্জুর উচ্ছ্বাস। আমিও রসিকতা করে বললাম, হ্যা, তোর জন্যই কিনলাম। সঞ্জু এক গাল হেসে বলল, ভালোই করেছিস। অনেকদিন ধরেই একজোড়া চটি কিনবো কিনবো করছি… শালার টাকা পয়সার যা ক্রাইসিস যাচ্ছে ইদানিং।

অবস্থা বেগতিক। এরপর সঞ্জু নিজেই হয়তো আমার কাছে টাকা চেয়ে বসবে। আমি হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে বলি, অনেক রাত হয়েছে। যা, বাসায় যা। আমিও বাসায় যাই।

সঞ্জু বলল, কেন ডাকলি? শুধু এই স্যান্ডেল দেওয়ার জন্য।

আমি ছোট্ট করে ‘হ্যা’ বলে হাঁটা শুরু করি। একটু পর পিছন ফিরে দেখি, সঞ্জু ওর পুরনো স্যান্ডেলজোড়া নতুন স্যান্ডেলের প্যাকেটে ঢুকিয়ে নতুনজোড়া পায়ে গলিয়ে বেশ বাদশাহী ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে।

পকেট থেকে আবারও ফোন বের করি। চিনিকে ডায়াল করি। এই মুহূর্তে…।

মেসে ফিরতে ইচ্ছা করে না। লালমাটিয়ার ফাঁকা রাস্তায় পাগলের মতো একা একা হাঁটি। গতকাল ছোট বোন ফোন করেছিল। মার অসুখ নাকি বাড়ছে। গ্রামে ভালো কোনো ডাক্তার পাওয়া যায় না। মাকে ঢাকায় আনা উচিত। আব্বা এসব নিয়ে ভাবেন না। ইশকুলের মাস্টারি থেকে রিটায়ার্ড করার পর মনে হচ্ছে জগৎ সংসার থেকেই অবসর নিয়েছেন।
ফোন হাতেই আছে। চিনিকে ডায়াল করা অব্যাহত আছে।

অনেক রাতে মেসে ফিরি। সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার খেতে ইচ্ছা করে না। আমি ডায়েরি খুলে লিখতে শুরু করি :

মনটাকে আকাশ কল্পনা করে বলবো না যে এই মনে অনেক মেঘ জমেছে। কিংবা মনটাকে এক বদ্ধ জলাশয় ভেবে বলবো না সেখানটায় বিস্তর শ্যাওলা-জঞ্জাল আসন পেতেছে। যেহেতু খুবই সাধারণ একজন আমি, তাই খুব সাধারণভাবেই বলছি, আমার মন ভালো নেই।

তোমরা তোমাদের ‘ভাল্লাগেনা’ ভাবটা নিয়ে অনেক কাব্য করতে পারো। তোমাদের মন খারাপের কারণগুলো রসিয়ে রসিয়ে বলতে পারো। কান্নার মাঝে রঙ খুঁজতে পারো। বেদনাকে নীল শাড়ি পড়াতে পারো। আমি পারি না। আমার কাছে কষ্টকে ‘কষ্ট’ই মনে হয়, লাল আগুন মনে হয় না। বেদনাকে স্রেফ বেদনাই মনে হয়।

অনেকবার ভেবেছি, আমিও অসাধারণ হবো। তোমাদের মতো করে প্রিয় মাানুষটিকে নানান উপমায় সাজাবো। পারিনি। তার ভাসা ভাসা চোখ জোড়াকে কখনো পাখির নীড় বলে মনে হয়নি। দীঘল চুলকে ঝরণা ধারা বলে বিভ্রম হয়নি। কতবার ভেবেছি ওই অধর জোড়াকে গোলাপের পাপড়ি মনে কওে শিহরিত হবো। পারিনি। দেয়ালের ওই টিকটিকি সাক্ষী, কত নির্ঘুম রাত পাড়ি দিয়েছি তাকে কয়েকটা কথা লিখব বলে। কাগজ কলম পড়ে থেকেছে অসহায়ের মতো, আমার ভেতর থেকে একটি শব্দও বের হয়নি। কী ভীষণ ইচ্ছা করত, একটু আবেগসহযোগে তাকে এই মনের আকুতি জানাই। পারিনি। পারিনি। আমার ভালোবাসা তাই শেষাবধি একটা সাদামাটা ভালোবাসাই রয়ে গেল।

পারবো কী করে? আমি যে আমার বাবার মতোই সাধারণ একজন। আমি যে আমার বাবার রক্তই নিজের শরীরের বহন করছি। যখন ভাবি, কাল থেকে আমিও ঠিক তোমাদের মতো চুলে জেল মেখে, প্যান্টটাকে কোমরের আর একটু নিচে বেঁধে, রঙ্গিন চশমায় চোখ ঢেকে সারা ক্যাম্পাস দাপিয়ে বড়োবো ঠিক তখনই বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ‘অসহায়ত্ব’ আমার পথ আগলে দাঁড়ায়। আমি আর তোমাদের মতো অসাধারণ হতে পারি না।

তবে কী বাবা তার আজন্ম লালিত দীনতা, হীনতা, দারিদ্রতা আর একাকীত্ব, অসহায়ত্ব একটু একটু করে আমার নামে উইল করে দিচ্ছেন?

লিখেছেন: মারুফ ইসলাম
সাংবাদিক, সাহিত্যিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *