উবার, পাঠাও’রা দিন শেষে ক্ষতিই করছে

শেয়ার করুনঃ

উবার, পাঠাওসহ নানা ধরণের বেসরকারি সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলো শ্রম বাজারে একটা অস্বাভাবিকতা কিংবা বিকৃতি ঘটাচ্ছে। এর ফলাফল কি হবে সেটা সাধারণ অর্থনীতির কোন মডেলে ফেলা যাচ্ছে না। কারন এরকম বিকৃতি এর আগে ঘটেছে কিনা জানা নাই। বিষয়টা বুঝিয়ে বলছি।

এক সময় বস্তির ছোট ছোট ছেলে, তরুণ কিংবা মহিলারা অফিসে অফিসে টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার পৌছে দিত। পায়ে হেঁটে হেঁটে। এটা অনেক পূরোনো একটা কালচার ছিল। নিম্ন আয়ের, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন জনগোষ্ঠির জন্যে এই কাজটা একটা লাইফ লাইন ছিল, কেননা তাদের জন্যে এর বাইরে আর সহজে করার মতো কাজ হয়তো ছিল না।

এখন চিন্তা করেন, উবার, পাঠাও, কিংবা ফোনের অ্যাপ দিয়ে খাবার ডেলিভারী করার যে কালচার চালু হলো, সেই কালচারে এইসব নিম্ন আয়ের মানুষদেরকে কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলছে? সমাজের কোন শ্রেনী তাদের কাজ খেয়ে ফেলছে, এবং কিভাবে খাচ্ছে।

শুরুতে একজন পাঠাও ড্রাইভারের সাথে একজন সিএনজি ড্রাইভার, টেম্পো ড্রাইভার, কিংবা রিকশা চালকের তুলনা করেন। তারপর একজন টোকাই, যে অফিসে অফিসে টিফিন সরবরাহ করতো, তার সাথে অ্যাপ এর সাহায্যে মোটর সাইকেল চালিয়ে যে ছেলেটি খাবার ডেলিভারি করছে তার তুলনা করেন।

তুলনা করলে বুঝতে পারবেন, এখানে নিম্ন আয়, নিম্ন জ্ঞান, নিম্ন প্রযুক্তির, নিম্ন স্তরের একই কাজকে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে তুলনামূলক ভাবে উচ্চ আয়, উচ্চ জ্ঞান এবং উচ্চ স্তরের মানুষ দিয়ে। এটা একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার। কারণ সাধারনত নিম্ন স্কিলের মানুষের ধীরে ধীরে উন্নতি করে উচ্চ স্কিলের কাজ করে। উল্টাটা তো হবার কথা না।

মানে হচ্ছে, মোটর সাইকেল কিনতে রিকশা কেনার চাইতে বেশী টাকা লাগে, উন্নত প্রযুক্তি জ্ঞান লাগে (অ্যাপ চালানো)। কিন্তু মোটা দাগে পাঠাও চালক আর রিকশা চালক এর কাজটা তো একই। শুধু একটা অন্যটার চায়ে দ্রুত গতির।

যে ছেলেটি মোটর সাইকেলে করে, অ্যাপ চালিয়ে ফুড ডেলিভারি করছে, তাকে ওইসব নিম্ন আয়ের মানুষদের থেকে বেশী জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার জানতে হচ্ছে, যদিও তারা উভয়ই এই কাজ করছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে একই পারশ্রমিকের বিনিময়ে। যদি আপনি মোটর সাইকেল রক্ষণাবেক্ষণ এর খরচ বিয়োগ করেন।

এবার আসি পূজিতে। কম পুজির টোকাই কিংবা রিকশাচালক, অধিক পূজির পাঠাও ড্রাইভারের কাছে ধরা খাচ্ছে, পুজি আর প্রযুক্তির সাথে ধাতস্ত না হওয়ার ফলে। কিন্তু প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের ধীরে ধীরে উচ্চতর কাজ করার কথা, রিকশা চালক কিংবা টিফিন সরবরাহকারী টোকাই এর কাজ না।

সামাজিক ভাবে চিন্তা করলে, যেই কুলীন মধ্যবিত্ত রিকশা চালককে তুই তুকারি করেছে, তার ভাই কিংবা শালা অ্যাপ দিয়ে পাঠাও চালাচ্ছে, এটা হাসি মুখে মেনে নিচ্ছে। এই হাসি মুখটা খুবই ভালো এবং প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু কাজের যে ট্রান্সফারটা এখানে হচ্ছে সেটা প্রশংসার যোগ্য না হয়ে চিন্তার খোরাক হচ্ছে।

কেননা প্রযুক্তির ব্যবহার ও বন্টন সুষম হলে মধ্যবিত্তের জন্যে নতুন প্রযুক্তি দিয়ে আরো বেশী বেশী উচ্চস্তরের কাজ তৈরী হবার কথা। উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহার করে মধ্যবিত্তের জন্যে আরো বেশী টাকা কামানোর পথ তৈরী হবার কথা। প্রযুক্তি দিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষদের কাজ করার কথা না।

আরও যেটা জটিল প্রশ্ন সেটা হলো, সমাজের উচ্চ তলার মানুষ যখন নিচের তলার কাজ করা শুরু করে, সেটা শুধু নতুন আইডিয়া কিংবা প্রযুক্তির কারণে শুরুতে “কুল” মনে হলেও, এক সময়ে এই কুলনেস চলে যাবে। “কুল” ফ্যাক্টর কেটে গেলে একদিন মধ্যবিত্ত চিন্তা করবে এটা কি এমন প্রযুক্তি পেলাম যেটা আমাকে রিকশা চালকের পর্যায়ে নামালো?

আর রিকশা চালকেরা হিসাব মেলাবে, তুলনামূলক ভাবে বড় লোকের ছেলেপুলে যে আমাদের কাজ নিয়ে নিল, এখন আমরা কোন দিকে যাবো?

লিখেছেন: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ভূতাত্ত্বিক কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *