স্বাধীনতার ৪৭ বছরে এমন নজির নেই

শেয়ার করুনঃ

পিপলস লিজিং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নামের দুই হাজার কোটি টাকার একটি নন ব্যাংকিং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে সরকার দেউলিয়া ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে । এই সিদ্ধান্তের কারণে শুধু পিপলস লিজিং নয় দেউলিয়া হবে পুঁজি বাজারের অসংখ্য সাধারণ বিনিয়োগকারী যাদের হাতে আছে পিপলস লিজিনের দুই শত কোটি টাকার শেয়ার।

এই সিদ্ধান্তের দুইটি প্রধান দিক রয়েছে।

প্রথম দিক টি হচ্ছে বাংলাদেশ এবং বিদেশের অনেক ইনভেস্টর এতো দিন মনে করতো অর্থনৈতিক খাতে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার জন্যে বাংলাদেশ সরকার যে কোনো মূল্যে অর্থনৈতিক কোম্পানি গুলোকে রক্ষা করবে এই ধারণা টি মস্ত রকম ভুল।

দ্বিতীয় দিক হচ্ছে খেলাপি ঋণের কারণে আগামী বছরগুলোতে যে ব্যাংক এবং নন ব্যাংকিং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হবে তার দায়ও সরকার বা কোম্পানির পরিচালক নয়-উল্টা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কেই নিতে হবে।

পিপলস লিজিংয়ের দেউলিয়া ঘোষণা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা। কারণ এই প্রথম সরকার একটি প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া হিসাবে ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এর পূর্বে বেসিক ব্যাংক এবং ফারমারস ব্যাংক সহ মন্দ ঋণের কারণে যে সকল ব্যাংক এবং ফাইনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলো খেলাপি হয়ে যাচ্ছিল সরকার তাদেরকে রক্ষা করেছে। কিন্তু পিপলস লিজিংকে সরকার রক্ষা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

স্বাধীনতার ৪৭ বছরে এই প্রথম কোনো সরকার একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া হতে দিচ্ছে। দুই হাজার কোটি টাকা অনেক বড় একটা অংক। ফারমারস ব্যাংকের দায় ছিল পাঁচ হাজার কোটি টাকার যা পিপলস লিজিংয়ের আড়াই গুন। এতো বছর ধরে চলা এতো বড় একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দুরবস্থার সূচনা হয় ২০১৪ সালে। যখন এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা এক হাজার কোটি টাকার ঋণ ভুয়া কাগজ তৈরি করে লুট করে নেয়।

এই সময় পুঁজিবাজারে এই প্রতিষ্ঠানটির মান ছিল এ ক্যাটাগরি। তার মানে সে সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এই কোম্পানিকে একটি ভালো কোম্পানি হিসেবে জেনে পিপলস লিজিংয়ের দুইশো কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এই টাকা তারা আর ফেরত পাবেন না।

এর কারন, বাংলাদেশের দেউলিয়া আইন অনুসারে একটি কোম্পানি দেউলিয়া হলে সেই কোম্পানিটির বিভিন্ন সম্পদ বিক্রয় করে তা সবার প্রথমে পাওনাদার তারপর অগ্রাধিকার শেয়ার হোল্ডার এবং সবার শেষে পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দেয়া হয়।

২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত পিপলস লিজিং এর প্রাথমিক নিট সম্পদের পরিমান দুই শত পঁচাশি কোটি টাকা। সাধারন বিনিয়োগকারীদের যার মধ্যে দুই শত কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে।

কোম্পানির খেলাপি ঋণের পরিমান এক হাজার কোটি টাকা। মোট লোকসান ৭৬ কোটি টাকা।

বর্তমানে কোম্পানির শেয়ার প্রতি নেট এসেট ভ্যালুর পরিমান-মাইনাস একষট্টি। ফলে পাওনাদারদের ঋণ পরিশোধের পরে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো অর্থই ফেরত পাবেন না।

পিপলস লিজিংয়ের ৭০% শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং মাত্র ৩০% পর্ষদ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। তার মানে একটা পরিষ্কার নীল নকশা ছিল, বিনিয়োগকারীদের হাতে কোম্পানির অধিকাংশ শেয়ার ছেড়ে দিয়ে, তাদের সর্বস্বান্ত করার- যা বুঝতে না পারার পুরো দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের- কারন বাংলাদেশ ব্যাংক নন ব্যাংকিং ফিনান্সিয়াল অরগানাইজেশান গুলোর রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান।

এখন, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কেন আরো আগেই পিপলস লিজিং ফাইনান্সিয়াল কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করেনি? কারণ গত বছর মানে দুই হাজার আঠারো সালেও পিপলস লিজিং ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির এক একটি শেয়ার দশ টাকা দরে বিনিয়োগকারীরা কেনাবেচা করছিলেন।

দশ টাকা ফেসভ্যালুর, সেই শেয়ারের দাম, এখন তিন টাকায় নেমে এসেছে – যার তার সার্কিট ব্রেকার ভ্যালু। এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পাগলের মতো তাদের শেয়ার বিক্রয় করার জন্যে ক্রেতা খুঁজছেন কিন্তু এই সব শেয়ারের আর কোনো ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

পৃথিবীতে কেউ তো আর পাগল হয় নাই যে, একটি শেয়ার কিনবে যার থেকে কোনো অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে না।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে কোম্পানির অধিকাংশ শেয়ার বেচে দিয়ে তারপর কোম্পানিকে লুট করে দেউলিয়া বানানোর এই চক্রান্তের শিকার লক্ষ লক্ষ সাধারণ বিনিয়োগকারী এখন পথে বসবে।

পিপলস লিজিং থেকে এই শিক্ষাই নেয়া যায় যে, লেন্ডার অফ দা লাস্ট রিজরট হিসেবে সরকার তার যে ভুমিকা রাখবে বলে নির্বাচনের আগে সবাইকে কথা দিয়েছিল, সেই ভুমিকা রাখতে সরকারের আর কোন আগ্রহ নেই। কারন তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থাই ভালো না।

এবং খেলাপি ঋণের কারণে আগামী বছরগুলোতে যে ব্যাংক এবং নন ব্যাংকিং ফিনান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হবে তার দায়ও সরকার বা পরিচালকরা নয়- সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এবং দেশের মানুষকেই নিতে হবে।

লিখেছেন: জিয়া হাসান।
কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *